MysmsBD.ComLogin Sign Up

নক্ষত্র যেভাবে সৃষ্টি হয়

In বিজ্ঞান জগৎ - Tue at 8:42am
নক্ষত্র যেভাবে সৃষ্টি হয়

রাতের আকাশে কে না তাকিয়েছে। জ্বলজ্বল করা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আলোকবিন্দুর দিকে তাকিয়ে থাকার আনন্দ সবাইকেই আলোড়িত করে। এসব আলোকবিন্দুর মধ্যে কোনোটি মিটমিট করে জ্বলে আবার কোনোটি স্থির হয়ে জ্বলে।

মিটমিট করা এইসব আলোকবিন্দুকে তারা, স্টার কিংবা নক্ষত্র বলা হয়- এরা নিজে নিজে জ্বলে। আর স্থির আলোকবিন্দুকে বলা হয় গ্রহ বা প্ল্যানেট- এরা নক্ষত্রের আলোয় আলোকিত হয়। তবে গ্রহ থেকে তারার আলোর প্রতি আগ্রহ সবারই একটু বেশি থাকে। কোটি কোটি বছর ধরে তারা কিভাবে একই উজ্জ্বল্য ধরে রেখে জ্বলে আর কিভাবেই তাদের সৃষ্টি এই নিয়ে যুগযুগ ধরে মানুষের কৌতূহলের অন্ত নেই।

প্রাচীন যুগ থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত বহু মানুষই এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন। সময়ে সময়ে জন্ম নেওয়া বিভিন্ন জ্যোতির্বিজ্ঞানীও এর বিভিন্ন উত্তর দেবার চেষ্টা করেছেন। বিভিন্ন সময়ে এ নিয়ে নানা মতবাদও প্রচলিত হতে দেখা গেছে। তবে সবকিছু পেরিয়ে আজকের অধিকাংশ বিজ্ঞানীরা নক্ষত্র সৃষ্টির রহস্য নিয়ে একটি মতে উন্নীত হতে পেরেছেন।

এ পর্যন্ত বিভিন্ন গবেষণার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা যে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন তা হল- নক্ষত্রের উদ্ভব আসলে অন্ধকারে নিমগ্ন জমাটবাধা ঠাণ্ডা নীহারিকা থেকে। নীহারিকা হচ্ছে, মহাকাশের ব্যাপক ব্যাপক অঞ্চল নিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিস্তৃত বস্তুপুঞ্জ। নক্ষত্রের মতো নীহারিকার মধ্যেও রয়েছে শতকরা ৫০ থেকে ৭৫ ভাগ হাইড্রোজেন, শতকরা ২০ থেকে ৪৫ ভাগ হিলিয়াম এবং বাকি ৫ ভাগ অন্যান্য মৌলিক পদার্থ।

নীহারিকার হাইড্রোজেন হিলিয়াম প্রভৃতি গ্যাস এবং অন্যান্য গ্যাসীয় পুঞ্জসমূহ একত্রিত থাকা অবস্থায় সর্বক্ষণ অশান্ত বাতাসের মতো আন্দোলিত হতে থাকে। বস্তুত বিশাল অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত বাষ্পীয় পদার্থের স্বাভাবিক ধর্মই হল আন্দোলিত হওয়া। এ ধরনের আন্দোলন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলেও হয়ে থাকে। আর এই আন্দোলন চলতে চলতে একসময় গ্যাসীয় বস্তুপুঞ্জে ঘূর্ণির সৃষ্টি হয়। আর এই ঘূর্ণি থেকেই সৃষ্টি হয় তারা বা নক্ষত্র।

কিভাবে এই ঘূর্ণি থেকেই নক্ষত্রের জন্ম হয় তা বিশদভাবে বলা যেতে পারে। মূলত যখন বাতাস আন্দোলিত হতে হতে একসময় চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে বিভিন্ন স্থানে একাধিক ঘূর্ণি সৃষ্টি হয় তখন নীহারিকার প্রতিটি ঘূর্ণিকে কেন্দ্র করে তার চারপাশের বস্তুপুঞ্জ আকৃষ্ট হয়ে জমা হতে থাকে। এক্ষেত্রে বিশেষভাবে তখন মাধ্যাকর্ষণ বল সাহায্য করে। এর ফলে ঘূর্ণিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন গ্যাসীয় এইসব বস্তুপুঞ্জের সমাবেশ ঘটতে থাকে। একাধিক ঘূর্ণি এক হয়ে আসলে প্রথমে ছোট একটি কেন্দ্র গঠিত হয় এবং একটি গোলকের সৃষ্টি হয়।

নীহারিকায় এই ধরনের গোলকের আবির্ভাব বিজ্ঞানীরা ইতোমধ্যেই দূরবীন দিয়ে দেখতে পেরেছেন। এরপর গোলকের আকৃতিতে আসলে প্রথমে এটি ছোট থাকলেও ক্রমেই অভিকর্ষ বল চাঙ্গা হয়ে উঠলে সেই বলের প্রভাবে মহাবিশ্বে ছিটিয়ে থাকা আরো বেশি বস্তুকণা গোলকটির ভেতরে এসে সামিল হয়। এবং এইসব বস্তুকণার চাপে গোলকটি যতই সঙ্কুচিত হতে থাকে ততই তার ভেতরের চাপ ও তাপ বাড়তে থাকে। এভাবে বিশাল আয়তনের গোলকটি যখন সঙ্কুচিত হতে থাকে তখন তার ভেতরে যে তাপের সৃষ্টি হয় তা সত্যিই অপরিমেয়। প্রথম পর্যায়ে তাই তাপমাত্রা ১.২৫ থেকে ১.৫ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়। এরুপ বিপুল তাপমাত্রার কারণে গোলকের কেন্দ্রস্থলে পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু হয় এবং হাইড্রোজেন পরমাণু মিলিত হয়ে হিলিয়াম পরমাণু গঠন করে।

হাইড্রোজেন পরমাণু থেকে হিলিয়াম পরমাণু সৃষ্টির সময় প্রচুর পরিমাণে শক্তি মুক্ত হয়ে পড়ে। এভাবে এই শক্তি মুক্ত হওয়ার ফলে বস্তুপুঞ্জের ভেতরমুখী চাপ এবং হাইড্রোজেন পরমাণু থেকে নিঃসৃত বহির্মুখী শক্তির চাপ গোলকটিতে একটি সাম্যাবস্থা সৃষ্টি করে। এভাবে গোলকটি একটি স্থিতিশীল নক্ষত্রে পরিণত হয় এবং ক্রমাগত তেজ বিকিরণ করতে থাকে। নক্ষত্রের এই তেজ কিংবা আলোকরশ্মি বিকিরণ উৎসারিত হয় মূলত হাইড্রোজেন থেকে।

নক্ষত্র স্থিতিশীল অবস্থায় পৌঁছানোর পর হাইড্রোজেন পরমাণু হিলিয়ামে পরিণত হওয়ার সময় নক্ষত্রের এই আলো তৈরি হয়। নক্ষত্র বহুকাল ধরে এরূপ স্থিতিশীল অবস্থায় থাকে। আমাদের সূর্যে এখন এই ধরনের স্থিতিশীল অবস্থা চলছে।

বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, আমাদের সৌরজগতের কেন্দ্রবিন্দু সূর্য্যিমামা ইতোমধ্যেই তার প্রায় অর্ধেক হাইড্রোজেন জ্বালানি পুড়িয়ে ফেলেছে। এবং আগামী তিনশ কোটি থেকে পাঁচশো কোটি বছরের মধ্যে সূর্যের সব জ্বালানি শেষ হয়ে আসবে। আমাদের সৌরজগতে সূর্যে বস্তুর পরিমান সবচেয়ে বেশি। বিজ্ঞানীরা বলছেন- সমগ্র সৌরজগতে সর্বমোট যে পরিমান বস্তু আছে তার ৯৯.৮৭ শতাংশ রয়েছে সূর্যে, আর মাত্র ০০.৩ শতাংশ রয়েছে সৌরজগতের বাকি সব সৃষ্টিতে। এই জ্বালানি শেষ হয়ে আসলে সূর্য আরো স্ফিত হয়ে বুধ শুক্র পৃথিবী এমনকি মঙ্গলকেও গ্রাস করে ফেলতে পারে। এছাড়া বিশেষ অবস্থায় পৌঁছে একটি বড় ধরনের বিস্ফোরণও ঘটতে পারে। তারপর থেকেই সূর্যের সংকোচন অবস্থা চলবে। এবং সংকোচিত হতে হতে সূর্য একসময় শীতল ও আলোকহীন হয়ে পড়বে।

বিশদ গবেষণার পর বিজ্ঞানীদের ধারণা- নীহারিকা থেকে নক্ষত্র সৃষ্টি হয়ে একটি নির্দিষ্ট সময় পর আবার তা পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসে। অর্থাৎ একসময় শীতল এবং আলোকহীন হয়ে পড়াই নক্ষত্রের ধর্ম। তাদের ধারণা মহাবিশ্বের সকল বস্তুই রিসাইকেল প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত। এবং এটি নিয়মিত ঘটে চলেছে।

তথ্য সহায়তা :
* রিলেটিভিটি : দ্য স্পেশাল অ্যান্ড দ্য জেনারেল থিওরি-আলবার্ট আইনস্টাইন
* মহাকাশের ঠিকানা- অমল দাশগুপ্ত
* সৌরজগৎ-সুব্রত বড়ুয়া
* তারার দেশের হাতছানি- আবদুল্লাহ আল-মুতী
* সূর্যের বন্দী- ড. শঙ্কর সেনগুপ্ত

Googleplus Pint
Anik Sutradhar
Posts 6748
Post Views 159