MysmsBD.ComLogin Sign Up

স্বপ্ন এখন ৩৩ রান দূরে

In ক্রিকেট দুনিয়া - Oct 24 at 7:27am
স্বপ্ন এখন ৩৩ রান দূরে

এই টেস্টের পরমায়ু হবে অনন্তকালের। বাংলাদেশের ক্রিকেটাকাশে বিরল ও বিশাল নক্ষত্রের মতো তা আলো ছড়াবে চিরদিন। উল্লাসের। অহংকারের। প্রেরণার। কেবল যদি আজ সকালে করতে পারে ওই ৩৩ রান।

৩৩ রান আর এমন কী! স্বপ্নের স্বর্গোদ্যানের সঙ্গে ওই ছোট্ট সেতুর দূরত্বে এখন বাংলাদেশ। আশার জাহাজের মাস্তুলে তাই পতপত করে উড়ছে লাল-সবুজের পতাকা। কিন্তু হাতে যখন মাত্র দুই উইকেট, সমান্তরালে আশঙ্কার ঘূর্ণি হাওয়াও তো রয়েছে। তীরে এসে না আবার ডুবে যায় তরী! আবার না স্বপ্নের পাখিটা ডানা ভেঙে হারিয়ে যায় নীল নভোরীক্ষে! ২০০৩ সালে মুলতানে পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচের মতো। কিংবা ২০০৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্টের মতো। অথবা ২০০৮ সালে এই চট্টগ্রামেই নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে খেলার মতো।


বালাই ষাট, ওসব অলক্ষুণে ম্যাচগুলোর কথা এখন নাই-বা আনা হোক! আজ সকালে বরং ১৬ কোটি ক্রিকেটপ্রাণের বরং ঘুম ভাঙুক নতুন স্বপ্ন নিয়ে। ৫৬ হাজার বর্গমাইলের মানচিত্র না হয় জেগে উঠুক নতুন আশায় সওয়ার হয়ে। ওই ৩৩ রানের প্রার্থনায়!

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এই টেস্টের শুরুতে বাংলাদেশকে নিয়ে কেউ বাজি ধরেনি। স্বয়ং কোচ চন্দিকা হাতুরাসিংহেও নয়। যে কারণে তিনি অবলীলায় বলতে পারেন, ২০ উইকেট নেওয়ার সামর্থ্য তাঁর দলের নেই। জয়টা হবে বোনাস। কে জানে, শিষ্যদের তাতিয়ে তোলার জন্যই এই শ্রীলঙ্কানের ওই কৌশল কি না! যে কৌশলের ‘মধুরেণ সমাপয়েৎ’ হবে আজ মহার্ঘ্য ওই ৩৩টি রান করতে পারলে।

টেস্টের আগে যেমন-তেমন, চতুর্থ দিনের আবহে তো বাংলাদেশের সম্ভাবনা ছিল আরো কম। হাতে দুই উইকেট নিয়ে ২৭৩ রানে এগিয়ে তখন ইংল্যান্ড। চট্টগ্রামের ঘূর্ণি উইকেটে চতুর্থ ইনিংসে এত তাড়া করে কিভাবে জিতবে বাংলাদেশ! কাল সকালে ২৪০ রানে প্রতিপক্ষের পাততাড়ি গুটিয়ে ফেলার পরও আশার সলতেয় আগুন জ্বলেনি সেভাবে। ২৮৬ রানের লক্ষ্যে পৌঁছা যে অলৌকিক এক স্বপ্নের মতো।

কিন্তু বাংলাদেশের ক্রিকেটবীররা যে স্বপ্নের মশাল হাতে ঠিকই এগিয়ে যান দ্বিতীয় ইনিংসে। তামিম ইকবাল মাত্র ৯ রান করে আউট হলেও প্রায় ১০ ওভার স্থায়ী ওপেনিং জুটির কারণে কোচের কাছে তা মনে হয় ফিফটির সমান। ইমরুল কায়েস-মমিনুল হকের জুটিতে ১ উইকেটে ৮১ রানের ভালো অবস্থানে চলে যায় স্বাগতিকরা। মনের গোপন গহিন থেকে স্বপ্নের ফড়িং তখন পাখা মেলতে শুরু করে। কিন্তু নিয়মিত বিরতিতে উইকেট পতনে ১৪০ রানে ৫ উইকেট তো হারিয়ে ফেলে দ্রুত। ইমরুল (৪৩) সুইপ করতে গিয়ে তুলে দেন ক্যাচ। আম্পায়ারের আঙুল না উঠলেও রিভিউ নিয়ে মমিনুলকে (২৭) প্যাভিলিয়নের পথ দেখান গ্যারেথ ব্যাটি। ভালো খেলতে খেলতে মাহমুদ উল্লাহ (১৭) একই বোলারের বলে একইভাবে এলবিডাব্লিউর শিকার। আর প্রথম ইনিংসের ব্যাটিং-আত্মাহুতির প্রায়শ্চিত্তের প্রতিশ্রুতি দেওয়া সাকিব আল হাসানও (২৪) ক্যাচ দেন উইকেটের পেছনে। ফড়িংয়ের পাখার রং তখন মিলিয়ে যাওয়ার জোগাড়।

কিন্তু তাঁতের মাকুর মতো এদিক-ওদিক করতে থাকা ম্যাচের রোমাঞ্চের যে তখনো ঢের বাকি! পঞ্চম উইকেটে স্রোতের বিপরীতে সাঁতরে ৮৭ রান জুড়ে দেন মুশফিকুর রহিম ও সাব্বির রহমান। জয়ের দূরের বাতিঘর তাতে ক্রমশ আসে এগিয়ে। চলে আসে দৃষ্টিসীমায়, মাত্র ৫৯ রানের মধ্যে। কিন্তু তখনই যে অলক্ষ্যে শোনা যায় কুলক্ষণের ডাক। ১২৪ বলে ৩৯ রানের অসাধারণ এক টেস্ট-ইনিংস খেলা মুশফিকের সামনে থেকে আচমকা লাফিয়ে ওঠে ব্যাটির ছোড়া বল। যা তীর হয়ে বেঁধে বাংলাদেশের হৃদয়ে। অসহায় মুশফিক দেখেন, উঠে আসা বলটি তাঁর ব্যাটে লেগে মুঠোবন্দি ফিল্ডারের। হয়তো দেখেন পরাজয়ের আগাম ছবিটাও। ১১ রানের মধ্যে মেহেদী হাসান ও কামরুল ইসলাম বিদায় নিলে বিষাদের এক টুকরো মেঘে ঢেকে যায় মানচিত্র।

তা সরিয়ে সূর্যের মশাল জ্বলে ওঠে সাব্বির রহমানের ব্যাটে। তাইজুল ইসলামকে (১১) নিয়ে দিনের বাকি সময়টুকুন পার করে দেন নির্বিঘ্নে। আর অভিষেক টেস্টেই মহানায়ক হওয়ার পথে যান এগিয়ে। ৯৩ বলে অপরাজিত ৫৯ রানের পরিণত ইনিংস খেলেন। যেখানে তিন চারের পাশাপাশি রয়েছে মঈন আলীকে মারা দুটি ছক্কা। আজ সকালে এই সাব্বিরের ব্যাটের দিকেই খুব করে তাকিয়ে থাকবে বাংলাদেশ। সঙ্গী তাইজুলও দিচ্ছেন ভরসা। ২০১৪ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ঢাকা টেস্টে তিন উইকেটে জয়ের পথে তাঁর ব্যাটিংয়ের স্মৃতি আজ অনুপ্রেরণা দেবেন নিঃসন্দেহে।

দিন শেষে বাংলাদেশের কোচ চন্দিকা হাতুরাসিংহে বলে যান, তাঁর দেখা অন্যতম কঠিন উইকেটে ব্যাটিং করছে এখন বাংলাদেশ। মুশফিকের আউটই হয়ে থাকে যার প্রমাণ। তবে ওই আউটে ড্রেসিংরুম থেকে বিশ্বাসটা উবে যায় বলে বিশ্বাস নয় তাঁর, ‘মুশফিকের আউটের সময় আমি বাইরে বসে ছিলাম। সে কারণে ঠিক জানি না ড্রেসিংরুমে কী হয়েছে। ওখানে সবাই প্যানিক হয়ে যায়, তা আমি বলব না। সবাই তো জিততে চায়। আমরা সবাই আশা করছিলাম, সাব্বিরের সঙ্গে কাল পর্যন্ত কেউ যেন থাকে। সেটি তাইজুল ও শফিউল হতে পারে। কিন্তু ওরাও পারে ব্যাটিং করতে। এই উইকেটে ব্যাটিং করা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। আর মুশির বলটি যেভাবে লাফিয়ে ওঠে, তাতে কিছু করার নেই। আমরা যা করতে পারি তা হলো, বল অনুযায়ী খেলা। আর যদি তা ভিন্ন আচরণ করে, তাহলে তো কিছু করার নেই।’ এটিকে নিজের দেখা অন্যতম সেরা টেস্ট ম্যাচের মর্যাদাও দেন তিন দশক ক্রিকেটের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই শ্রীলঙ্কান।

৯৯ টেস্ট খেলা ইংল্যান্ডের পেসার স্টুয়ার্ট ব্রড আবার এটিকে স্বীকৃতি দেন নিজের খেলা সেরা পাঁচের একটি হিসেবে। সঙ্গে জয়গান ঘোষণা করে যান টেস্ট ক্রিকেটের, ‘কাল যে কী হবে, তা অনুমান করা খুব কঠিন। এটি ব্যাটসম্যানের এক ভালো ইনিংস কিংবা বোলারের দুই ভালো বলের ব্যাপার। এ কারণেই আমরা টেস্ট ক্রিকেট ভালোবাসি, তাই না! এটি দুর্দান্ত এক টেস্ট ম্যাচ। যেখানে দুই দলের ক্রিকেটাররাই যথেষ্ট দক্ষতা দেখিয়েছে। টেস্ট ক্রিকেটে ছয় শ-সাড়ে ছয় শর চেয়ে তিন শ-সাড়ে তিন শর ম্যাচ আমার বেশি পছন্দ। নিজেদের পারফরম্যান্স নিয়ে বাংলাদেশ গর্বিত হতে পারে। আর এই কন্ডিশনে নিজেদের দক্ষতা দেখাতে পারায় আমরাও গর্বিত। কেননা এই মাঠে আমরা ছয় বছর পর টেস্ট খেলছি। কাল ১১ জন খুব গর্বিত এবং ১১ জন ভীষণ হতাশ ক্রিকেটার থাকবে।’

বাংলাদেশের প্রার্থনা ১১ জন গর্বিত ক্রিকেটবীরকে বরণ করে নেওয়ার। সে জন্য আর ৩৩ রান হলেই হয়। মাত্র ৩৩ রান!

Googleplus Pint
Roney Khan
Posts 819
Post Views 383