MysmsBD.ComLogin Sign Up

প্রাচীন ঐতিহ্যের ঐতিহাসিক নিদর্শন চলনবিলের ‘হান্ডিয়াল’

In দেখা হয় নাই - Oct 17 at 6:44pm
প্রাচীন ঐতিহ্যের ঐতিহাসিক নিদর্শন চলনবিলের ‘হান্ডিয়াল’

ঐতিহ্যবাহী চলনবিলের পাদদেশে অবস্থিত চির সবুজে ঘেরা বনানী প্রাচীন জনপদ চাটমোহরের উপজেলার হান্ডিয়াল গ্রাম। হিন্দু অধ্যুাষিত এই ইউনিয়নে হিন্দু-মুসলমান সহবস্থান করলেও এদের মধ্যে সম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অত্যন্ত মধুর।

স্থানীয়রা জানান, খৃষ্টীয় ষোল শতকের শুরু থেকে উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় অবদি পোড়ামাটির ভাস্কর্যের রমরমা ব্যবসা ছিল। এক সময় হান্ডিয়ালে প্রচুর পরিমানে মাটির তৈরি ’হাঁড়ি’ ব্যবহার এবং তৈরী করা হত । সে কারনেই প্রথমে এর নাম ছিল হাড়িয়াল। পরবর্তীতে ইংরেজরা তাদের উচ্চারণের সুবিধার্থে ’হাড়িয়াল’ কে হান্ডিয়াল বলে নামকরণ করনে। সেই থেকেই সর্বত্র হান্ডিয়াল হিসাবে নাম ছড়িয়ে পড়ে। হান্ডিয়াল প্রাচীন ঐতিহ্যের সমাহার এবং তাঁর গর্ব করার মত রয়েছে বেশ কিছু পুরা কীর্তি। এক সময় এই হান্ডিয়ালে থানা, ইংরেজ নীলকুঠি বাড়ি , গোপীনাথের মন্দির ও বিগ্রহ মন্দির ও জমিদার বাড়ি ছিল। হান্ডিয়াল এতটাই বর্ধিঞ্চু এলাকা ছিল, যেখানে বাজারের এক দালানের (প্রায় ১ কিঃমিঃ ব্যাপী ) ছাদে উঠে সব দালান ঘোরা যেত। ১৯৪৫ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত হান্ডিয়াল থানা ছিল। এর পাশ দিয়ে বয়ে গেছে গুমানী , করতোয়া নদী।

জানা যায়, ১৭৬৫ খৃষ্টাব্দের পর বাংলা বিহার যে আট ভাগে বিভক্তি হয় তার মধ্যে হান্ডিয়াল ছিল হুগলি বিভাগের অর্ন্তভুক্ত। সংবাদ প্রভাকর ১২৬১ বঙ্গাব্দে ২৮ পৌষ সংখ্যায় উল্লেখ্য যে, জেলার আটটি থানার পাবনা , নাজিরগঞ্জ, মথুরা, পাংশা, হান্ডিয়াল , ধর্মপুর , কুষ্টিয়া ও খোকসা।
এক সময় হান্ডিয়ালে রেশ ও তুলা জন্য বিখ্যাত ছিল। কোম্পানী আমলে উন্নত বন্দর হান্ডিয়ালে গড়ে ওঠে রেশম ও তাঁতের কাপড়ের বেচা কেনার কুঁঠি। ওই সময়ে ভারতবর্ষে যত রেশম উৎপন্ন হতো,তার ৪ ভাগের ৩ ভাগই মিলত হান্ডিয়াল বাজারে । ব্রিটিশরা রেশম ও তুলা এখান থেকে ক্রয় করে নিয়ে যেত। হান্ডিয়ালে আরেক কিংবদন্তি ছিল ’ঘোষ’ পরিবার। এরা এমন ধারার দই তৈরী করতো যে, কলকাতার সাহেব- বাবুরা এখানকার সুস্বাদু মিষ্টি ছাড়া কিছুই বুঝত না। কথিত আছে, ইংরেজরা এই এলাকার মিষ্টির জন্য ৭শত’রও বেশি গোয়ালা (ঘোষ) পালন করত আর তাদের কাজ ছিল নানা ধরনের মিষ্টান্ন বানিয়ে সাহেবদের নিকট পাঠানো। ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর নিকট হান্ডিয়াল এতোটাই গুরুত্ব পায় যে, তারা এখানে বিশেষ পরগণা বানিয়ে কয়েকটি জমিদারকে সেখানে ব্যবসা-বাণিজ্য ও প্রশাসনিক নানা কাজে দায়িত্ব দেয়। ১৭৯০ খৃস্টাব্দে লর্ড কর্নওয়ালিশের সময় দশশালা বন্দোবস্ত চিরস্থায়ী কালিন পাবনার ভু’-সম্পত্তি নাটোর রাজ রামকৃঞ্চের সাথে বন্দোবস্ত করা হয়। হ্যামিলটনের লেখা ইন্ডিয়া গেজেটিয়ারে উল্লেখ করেন , হান্ডিয়ালের পাশ্ববর্তী এলাকা বন জঙ্গলে ডাকাতেরা লুকিয়ে থাকত। তাই নৌপথের যাত্রীদের রক্ষার জন্য ষোল দাঁড়ের একখানা দ্রুতগামী নৌকাসহ জনৈক জমিদার নিযুক্ত করেন। হান্ডিয়ালে তৃতীয় মুঘল স¤্রাট আকবরের রাজত্বকালে প্রশাসনিক কার্যক্রমের জন্য একজন সুবেদার ও একটি কাজী নিযুক্ত ছিলেন। শাহী সুবেদারের অধিনে ছিল মুঘলদের পাঁচ হাজার সেনা,ছিল সেনানীবাস।

হান্ডিয়ালের প্রাচীন নিদর্শন গুলোর দিকে তাকালে হান্ডিয়ালের পশ্চিমে রয়েছে পাকপাড়ায় ওলীয়ে কামেল হযরত শাহ মোখলেছুর রহমান (বুড়ো পীর) সাহেবের পবিত্র মাজার এবং ওরস শরীফ। প্রতিদিন দুর-দুরান্ত থেকে ভক্তবৃন্দ আসেন কবর জিয়ারত করতে।
জনশ্রুতি রয়েছে, সুদুর আরব জাহান থেকে বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারের উদ্যেশে যে ১৭ জন ওলীয়ে কামেলগণের আগমন ঘটে। এদের মধ্যে কেউ কেউ বাঘের পীঠে চড়ে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার নওগায় হযরত শাহ শরীফ জিন্দানী (রহঃ) আসেন, তেমনি করে মাছের পিঠে যেমন হযরত শাহ সুলতান মাহী ছয়ার (রহঃ) বগুড়ার মহাস্থান গড়ে কেউ বা উটের পিঠে করে ইসলাম প্রচার করার জন্যে আসেন। সেই ১৭ জনের ১জন হলেন হান্ডিয়ালের পাকপাড়ার পূর্ণভূমিতে এসেছিলেন ওলীয়ে কামেল হযরত শাহ মোখলেছুর রহমান (রহঃ)।
বিভিন্ন সুত্রে জানা যায়, তিনি সূদুর ইরান থেকে এসেছিলেন। যে কয়জন পীরে-কামেল বাংলাদেশে এসেছিলেন তার মধ্যে হযরত শাহ মোখলেছুর রহমান (রহঃ) ছিলেন বয়জেষ্ঠ্য। এ জন্যই তাঁকে বুড়ো পীর সাহেব বলা হয়ে থাকে।

আরো জানা যায়, ১২৯২ বঙ্গাব্দে গঙ্গাধর সরকার নামক একজন সরকারী সার্ভেয়ার বুড়োপীরের নিস্কন্টক জমি বাজেয়াপ্ত করতে চাওয়ায় তার রক্তবমি শুরু হয়। শেষে বুড়োপীরের দরগায় গিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করে আরোগ্য লাভ করেন।
এখানে রয়েছে প্রাচীন ঐতিহ্যর শেঠের বাংলো ঘর , অনুমান করা হয় সপ্তদশ কিংবা অষ্টদশ শতাব্দীতে এই বাংলা ঘরটি নির্মিত। মতান্তরে ১৭৭৯ বঙ্গাব্দে নির্মিত শেঠের বাংলোঘর এক বাংলা বা দু’চালা বিশিষ্ট ঘর। ঘরটি আয়তক্ষেত্রের এক খিলান বিশিষ্ট প্রবেশ পথ যুক্ত। এই বাংলা ঘরকে কেন্দ্র করে রয়েছে অনেক কল্প-কাহিনী। লর্ড ক্লাইভ এই ঘরটি জগৎ শেঠকে উপহার দিয়েছিলেন। ঘরটি চুন,সুরকী,পোড়া মাটির তৈরী। ঘরটির গাত্রে রয়েছে বহ প্রাচীন অসংখ্য দূর্লভ নকশা যা নিপূণ হাতের শৈলিতে ফুটে উঠেছে।


অনেকেই জানান,প্রাচীন সাহিত্য , হান্ডিয়ালের পূর্ব পাশে রয়েছে ঐতিহাসিক কুঠিবাড়ি। সেই আমলে সেখানে বিরাট আকর্ষনীয় চোখ ধাঁধাঁনো নৌবন্দর ছিল। মাল বোঝাই বিশাল বজরা নৌকা কলকাতা থেকে ঢাকায় যাবার পথে এখানে এসে নঙ্গর ফেলত এবং হান্ডিয়ালের ইতিহাস ঐতিহ্য ঘুর ঘুরে প্রাণভরে উপভোগ করত আর দই মিষ্টি খাওয়ার লোভ নিবারন করতে না পেরে এখানে সপ্তাহ অব্দি থেকে যেত। একমাত্র এখানেই কোম্পানী আমলের সমস্ত ভারতবর্ষে চার পঞ্চমাংশ রেশম আমদানী হত। এখন কালের পরিবর্তনের ধারায় এই নদীটি মরা নদীতে পরিনত হয়েছে। ধারনা করা হয়, এখানে অনেক বড় বড় রাজ প্রাসাদ ছিল। ১২৯৪ বঙ্গাব্দে প্রলয়ংকারী ভূমিকম্পে এই জনপদের অনেক স্থাপনা ধ্বংস হয়ে যায়। । তবুও এখনো রয়েছে প্রাচীন কৃতির ধ্বংসাবশেষ।

নীল চাষের জন্য এক সময়ে হান্ডিয়াল ছিল বিখ্যাত। উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে হান্ডিয়ালে ব্যাপক ভাবে নীল চাষ করা হত। বলতে হয় এখানকার কৃষকদের নীল চাষ করতে বাধ্য করা হত। তখন হান্ডিয়ালে ইংরেজ নীল কুঠিদের ব্যবসা-বাণিজ্য কেন্দ্র ছিল। উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে নীল উৎপাদন ও রপ্তানীর ব্যবসা ছিল রমরমা। কিন্তু উনিশ শতকের পর পঞ্চাশের দশকে এ বাজার মন্দা হয়ে আসে। কারন জমিদার গণ এর বিরুদ্ধে ছিলেন এবং নীলের জমির উপর অতিরিক্ত করের বোঝা চাপিয়ে রায়তদের লাভ করার আশা নির্মূল করে দিতেন। ফলে চাষিরা নীল চাষে অনাগ্রহ প্রকাশ করতে থাকে। নীলকরদের পীড়ন নীতির ফলে কৃষকরা ১৮৫৯-৬০ সালে বিদ্রোহ করে। অবশ্য ১৮৫৯ সালে যশোর ও নদীয়ায় এ আন্দোলনের সূচনা হয়েছিলেন। দ্রুত এ আন্দোলন নীল চাষের আওতাভূক্ত অপরাপর জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। সেই সময় দীন বন্ধু মিত্র রচিত নাটক নীল দর্পণ এবং কিশোরী চাঁদ মিত্র ও হরিশচন্দ্র মুখার্জীর পত্রিকায় প্রকাশিত মন্তব্য বিদ্রোহী রায়তদের পক্ষে জন মত গড়ে তুলতে সাহায্য করে। অবশেষে সরকারের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয় এবং ১৮৬০ সালে সরকার একটি কমিশন নিয়োগ করেন। এ কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশ হওয়ার পর বলপুর্বক নীল চাষে বাধ্য করার কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষনা করে একটি আইন পাশ করা হয়। সরকারের এ পদক্ষেপের ফলে নীল প্রতিরোধ আন্দোলনের অবসান ঘটে। ১৮৬০ সালে সরকার একটি কমিশন নিয়োগ করেন। এ কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশ হওয়ার পর বলপূর্বক নীল চাষে বাধ্য করার কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষনা করে একটি আইন পাশ করা হয়। সরকারের এ পদক্ষেপের ফলে নীল প্রতিরোধ আন্দোলনের অবসান ঘটে।

জগন্নাথ মন্দিরটি প্রত্বতাত্ত্বিক নিদর্শনসমুহ দেশের অমূল্য সম্পদ। বহু বছর পরও তার অবকাঠামোসহ নির্মান শৈলী আধুনিক প্রত্ব শৈলীকে হার মানায়। ওইসব নিদর্শন যখন নির্মাণ করা হয়েছিল ,তখনকার সমাজ ব্যবস্থা এত উন্নত শিক্ষা ছিল না,সহজলভ্য ছিল না নির্মাণ সামগ্রী। জগনাথ মন্দির একটি রতœ মন্দির। এই মন্দিরের বাহিরের চারিপাশে দেয়ালের সর্বত্রই ও দালানের দেয়ালে পোড়ামাটির ব্যাপক অলঙ্গকরণ করা রয়েছে এবং সুউচ্চ মিনার গায়ে অনেক নকশা রয়েছে। পঞ্চদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বা উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত নতুন করে মন্দির নির্মান চর্চা ব্যাপক রুপ লাভ করে। ধারনা করা হয় ষোল শতকের শুরুতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় আঞ্চলিক রীতিতে মসজিদ ও ব্যাপকভাবে মন্দির নির্মান শুরু হয়। কিন্তু প্রয়োগ পদ্ধতি ও প্রয়োগভঙ্গি সম্পূর্ন অন্য রকম । ওই সময়ে নির্মিত মন্দির নির্মান চর্চাকে নবপর্যায়ের মন্দির চর্চার সূত্রপাত হয়েছিল গ্রামে। প্রতিষ্ঠাতা ও স্থপতি দুইজনই গ্রামের জীবন ধারায় সম্পৃক্ত ছিলেন। এই মন্দিরের সবচেয়ে বড় পুজা হল রথপুজা। অনেক দুর-দুরান্ত থেকে প্রচুর ভক্তবৃন্দ আসেন। বর্তমানে এই মন্দিরের পুরাহিতের দায়িত্বে আছেন তপন গোসাই। দেশে-বিদেশে এই গোসাইয়ের অনেক ভক্তবৃন্দ রয়েছে। দীর্ঘ দিনের সংস্কারের অভাবে মন্দিরটির সৌন্দর্য নষ্ট হওয়ার পথে। তাই মন্দির কর্তৃপক্ষ ভক্তবৃন্দের আর্থিক সহযোগীতায় এর পাশেই পুরাতন মন্দিরের আদলে সম্পূর্ন নতুন রুপে আরেকটি মন্দির নির্মান করেন। তাই এলাকাবাসীর দাবী প্রাচীন নিদর্শন মন্দিরটিকে সরকার যেন সংরক্ষন করেন।

Googleplus Pint
Asifkhan Asif
Posts 1372
Post Views 127