MysmsBD.ComLogin Sign Up

মহাকর্ষ তরঙ্গের ট্র্যাজিক হিরো

In বিজ্ঞান জগৎ - Jun 16 at 4:40pm
মহাকর্ষ তরঙ্গের ট্র্যাজিক হিরো

মহাকর্ষ তরঙ্গের পরোক্ষ প্রমাণ দিয়েছিলেন হালস ও টেলর। প্রত্যক্ষ প্রমাণ কি মিলবে? মিলুক আর না মিলুক চেষ্টা তো করা চাই! হাতেনাতে মহাকর্ষ তরঙ্গকে কব্জা করার জন্য বিজ্ঞানীরা নিলেন নতুন উদ্যোগ। যুগ্ম তারা থেকে মহাকর্ষের যে তরঙ্গ তৈরি হয় তা এতদূরের পৃথিবীতে বসে ধরা এককথায় অসম্ভব। তবে আশার আলো আছে অন্যখানে।

মহাকাশে প্রতিনিয়ত নানান বড় বড় ঘটনা ঘটছে। বিস্ফোরণে চুরমার হয়ে যাচ্ছে কত নক্ষত্র, নক্ষত্রে সংঘর্ষ ঘটছে, বিরাট বিরাট ঘটনা পেরিয়ে জন্ম নিচ্ছে নতুন কত নক্ষত্র। এসব যজ্ঞের ভেতর থেকে যে মহাকর্ষ তরঙ্গ ছড়াবে তা নিশ্চয়ই অনেক শক্তিশালী, অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে। পৌঁছে যেতে পারে আমাদের এই পৃথিবীতেও। সেসব কি চেষ্টা করলে ধরা যায় না?

অনেকেই সে চেষ্টা করেছেন। তবে প্রথমে যে নামটা আসে, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোসেফ ওয়েবার। অসাধারণ একটা যন্ত্র তৈরি করে অসাধ্য সাধনের চেষ্টা করেছিলেন তিনি।

ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি অব অ্যামারিকা থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন এই গবেষত। যেখানে গবেষণা করেছেন আইনস্টাইন, সেখানেই গবেষণা করার সুযোগ মেলে তার। বিখ্যাত বিজ্ঞানী রবার্ট ওপেনহাইমার তখন ওই ইনিস্টিটিউটের ডিরেক্টর। জন আচিবল্ডর্ হুইলার ও ফ্রিম্যান ডাইসনের মতো বিজ্ঞানীরা তখন প্রিন্সটন ইনিস্টিউটরে গবেষক। নিষ্ঠা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে খুব সহজেই ওয়েবার ওই বিখ্যাত বিজ্ঞানীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন।

মার্কিন নৌবাহিনীতে ওয়েবার রাডার গবেষক হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিলো এই বিজ্ঞানীর। আলো ও তড়িৎ চুম্বক তরঙ্গ নিয়েই দিল তার কারবার। এই বিষয়গুলো তিনি উপভোগ করতেন। প্রিন্সটন ইনস্টিউটে কাজ করার সময় ওয়েবার বেছে নিলেন ‘লেজার রশ্মি’কে।

১৯৬০ এ স্থির করলেন মহাকর্ষ তরঙ্গ ধরবেন তিনি। এজন্য নিজের মতো করে বানালেন অদ্ভুত এক যন্ত্র। অ্যালুমিনিয়ামের দুটি সিলিন্ডার যার একটি বড় অন্যটি ছোট। বড় সিলিন্ডারে ওজন দেড়টন। লম্বায় ৫ ফুট। এটাই মূলত মহাকর্ষ তরঙ্গ ধরার ডিটেক্টর। সিলিন্ডারটিকে একটি সুরক্ষিত জায়গায় ঝুলিয়ে রাখা হলো। সেখানে অপ্রয়োজনীয় কোন তরঙ্গ নেই, বিদ্যুৎ ও চুম্বক ক্ষেত্রের প্রভাব নেই। বড় সিলিন্ডারটির পাশেই ঝোলানো হলো ছোট সিলিন্ডার।

নিউটনের মহাকর্ষ সুত্রানুযায়ী, মহাবিশ্বের সকল বস্তু পরস্পরকে আকর্ষণ করে। দুটি সিলিন্ডার ও মহাকর্ষ সুত্রানুযায়ী পরস্পরকে আকর্ষণ করবে। মহাকর্ষের আকর্ষণ বল নির্ভর করে বস্তু দুটোর ভর ও দূরত্বের ওপর। মহাকর্ষ বল বাড়ানো বা কমানো হলে বস্তু দুটোর মধ্যেও দূরত্বও বেড়ে যাবে বা কমে যাবে। মহাকর্ষ সূত্র বলে, দুটো বস্তুর মধ্যে যার ভর বেশি আকর্ষণ বল সেদিকে ক্রিয়া করে। পৃথিবীর আর একটা পাথরের তুলনা করা যাক। পৃথিবীর ভর পাথরের তুলনায় অনেক অনেক বেশি। তাই পৃথিবী একটা পাথরকে টেনে নিজের দিকে নিতে পারে। পাথর পৃথিবীকে টানতে পারে না।

[img]http://banglamail24.com/uploads/2016/06/16/2016_06_16_15_04_18_WSuJih0tC0lPI5BYlTxdZpgmNAS2D1_original.jpg[/img]
জোসেফ ওয়েবার ও তাঁর যন্ত্র

এখন মহাকর্ষ তরঙ্গের প্রভাবে সিলিন্ডারে বড় আয়তনের হ্রাস বৃদ্ধি ঘটতে পারে। বড় সিলিন্ডারের আয়তন বাড়া কমার অর্থ ছোট সিলিন্ডারের সাথে তার দূরত্বের কম বেশি হবে। দুরত্ব কম বেশি হওয়া মানে দুই সিলিন্ডারের মধ্যে ক্রিয়াশীল মহাকর্ষ বলের মানেরও পার্থক্য ঘটবে। ফলে ছোট সিলিন্ডারে মৃদু নড়াচড়া হবে। অর্থাৎ কম্পন দেখা দেবে ছোট সিলিন্ডারে। এ থেকেই প্রমাণ হবে মহাকর্ষ তরঙ্গের অস্তিত্ব।

তবে সমস্যা কিছু থেকেই যায়। বড় সিলিন্ডারের আয়তন কি শুধুই মহাকর্ষ বলে প্রভাবে বাড়ে কমে। নাকি অন্যকোনও কারণও থাকতে পারে। যেকানে সিলিন্ডার দুটি ঝোলানো হয়েছে স্বাভাবিক চোখে দেখে মনে হতে পারে আর কোনও বল, আর কোন বাহ্যিক প্রভাব সেখানে নেই। কিন্তু যদি মহাজাগতিক কিংবা কোনও বৈদ্যুতিক চুম্বকীয় প্রভাব আড়াল থেকে থেকে কলকাঠি নাড়ায়? ওয়েবার ভাবলেন, পরীক্ষাটি শুধু এক জায়গায় করলে হবে না। একই সাথে দুটি ভিন্ন স্থানে করতে হবে। সুতরাং আরেকটা যন্ত্রের দরকার হবে। ওয়েবার তাই করলেন। দুটো যন্ত্র রাখলেন দুজায়গায়। একটা মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। আরেকটা রাখলেন দু হাজার কিলোমিটার দূরে আরগোন ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিতে। যদি দু জায়গায় সিলিন্ডারের দৈর্ঘ্য বাড়ে কমে একই হারে তবে বুঝতে হবে মহাকর্ষীয় তরঙ্গের প্রভাবেই সেটা হয়েছে।

পরীক্ষাগুলো করার পর ওয়েবার বিভিন্ন জার্নালে ফলাফলগুলো প্রকাশ করলেন। ফলাফলে দেখানো হলো মহাকর্ষ তরঙ্গের প্রভাবে বড় সিলিন্ডারে আয়তন বাড়ছে বা কমছে ১ মিলিমিটারের ১,০০,০০,০০,০০,০০,০০০ ভাগের এক ভাগ মাত্র। হই চই পড়ে গেল চারদিকে। বিজ্ঞানী মহলে ধন্য ধন্য রব উঠল ওয়েবারের নামে। এত বছরের অধরা তরঙ্গ তবে কি অবশেষে ধরা দিল? রাতারাতি তারকা খ্যাতি পেয়ে গেলেন ওয়েবার। মিডিয়া, সাংবাদ সম্মেলন, বৈজ্ঞানিক সম্মেলন--সর্বক্ষেত্রে তাঁর জায়গান।

কিন্তু প্রদীপের নিচে অন্ধকার থাকে। আলোর দিকে দৃষ্টি ফেলে রাখলে সে অন্ধকার চোখে পড়ে না। আসলে ঘাপলা ছিল ওয়েবারের পরীক্ষায়। অনেকের মনেই সন্দেহ দেখা দিল। ওয়েবার যে যন্ত্র তৈরি করেছেন, তার সাহায্যে আদৌ কি মহাকর্ষ তরঙ্গ শণাক্ত সম্ভব? অনেকের সন্দেহ হলো। সুতরাং ওয়েবারে পদ্ধতিতে যন্ত্রপাতি তৈরি করে অনেকেই পরীক্ষা করতে নামলেন। তারা যে ফল পেলেন তা ওয়েবারের ফলের সাথে মেলে না। আসলে মহাকর্ষ তরঙ্গ ধরার ওয়েবারের দাবিই হুমকির মুখে দাঁড়ালো। একের পর এক প্রমাণ আসতে শুরু করল, ওয়েবার বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় নামে জোচ্চুরি করেছেন। তাদের দাবি যে ঠিক তা এক সময় ধ্রুব সত্যে পরিণত হলো।

মহাকর্ষ শণাক্ত করেছে যে যন্ত্রটি তার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা কিপ থর্ন অবশ্য স্বীকার করেছেন, ওয়েবারই তাঁকে উদ্বুদ্ধ মহাকর্ষ শণাক্তকরণে। তাই চলতি বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি যখন ওয়াশিংটনের বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে যখন মহাকর্ষ তরঙ্গ শণাক্তকরণের ঘোষণা দেন বিজ্ঞানীরা, সেখানে ওয়েবারের স্ত্রীকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এক সময়ের ব্রাত্য বিজ্ঞানীকে তাঁর হারানো সম্মান ফিরিয়ে কিছুটা হলেও ফিরিয়ে দেওয়ার এই প্রয়াস অবশ্যই প্রসংসার দাবিদার।

Googleplus Pint
Anik Sutradhar
Posts 7016
Post Views 94